• Meni 1
  • Meni 1
  • Meni 1
  • Meni 1
  • Meni 1

রাজশাহী: শুক্রবার, ১৭ আগস্ট ২০১৮

নাটোরে জিআর প্রকল্পে অতিথি আপ্যায়নে দেড় কোটি টাকা

আনোয়ার পারভেজ, নাটোর: নাটোরে অতিথি আপ্যায়নের নামে নাটোর সদর ও নলডাঙ্গা উপজেলায় মানবিক সহায়তা কর্মসূচি (জিআর) এর আওতায় বরাদ্দ দেয়া দেড় কোটি টাকার মোট চারশ’ ৬০মেট্রিক টন চাল ব্যয় করা হয়েছে। অনেকেই বলেছেন এটা হরিলুট হয়ে গেছে।
নাটোর সদর ও নলডাঙ্গা উপজেলায় অনুসন্ধান চালিয়ে জানা গেছে, চলতি অর্থ বছরের নাটোর সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন এবং পৌর এলাকার মোট দুইশ’ ২২টি প্রকল্পের আওতায় তিনশ’ মেট্রিক টক এবং নলডাঙ্গায় একশ’ নয়টি প্রতিষ্ঠানের নামে একশ’ ৬০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই এক টন করে তবে বিশেষ ক্ষেত্রে তিন মেট্রিক টন চালও বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ওই দুই উপজেলার মোট তিনশ’ ৩১টি প্রতিষ্ঠান প্রধানদের নামে সর্বমোট চারশ’ ৬০মণ চাল বরাদ্দের জন্য দুইশ’ ৩৯টি ডিও লেটার দেয়া হয়। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে সরকারি/বেসরকারি/এতিমখানা/লিল্লাহ্ বোর্ডিং/শিশু সদন/অনাথ আশ্রম/মুসাফিরখানা ও বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিতরণের জন্য সরকারের ত্রাণ ও দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখা থেকে বিতররণের জন্য ওই চালের বরাদ্দ পাওয়া গেছে। বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান প্রধানরা প্রায় সবাই সরকার দলীয় স্থানীয় নেতাকর্মী। বরাদ্দ পাওয়া এসব চাল বিক্রির টাকা দিয়ে স্থানীয় মসজিদ, মাদরাসা, এতিম খানা ও ইসলামী জলসা এবং বিভিন্ন মন্দিরের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে শুধুমাত্র অতিথি আপ্যায়নেই ব্যয় করা হয়েছে। সবখানেই বরাদ্দকরা চাল না দিয়ে সরকারী নিয়ম বহির্ভভুত ভাবে চাল বিক্রির নগদ টাকা দেয়া হয়েছে। কোন প্রতিষ্ঠানেই বরাদ্দ পাওয়া সব চালের দাম দেয়া হয়নি এমন অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নাটোর সদর উপজেলার দিঘাপতিয়া ইউনিয়নের ধরাইল হাফিজিয়া ক্বওমী মাদরাসার ইসলামী জলসায় অতিথি আপ্যায়নের জন্য প্রতিষ্ঠান প্রধান স্থানীয় নরুল ইসলাম নাজিমের নামে তিন মেট্রিক টন জিআর এর চাল বরাদ্দ দেখানো হলেও তিনি দলীয় এক নেতার মাধ্যমে সর্বসাকুল্যে নগদে পেয়েছেন মাত্র সাত হাজার টাকা। একই ইউনিয়নের ফজলুল উলুম ক্বওমী মাদরাসার নামে তিন মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেখানো হলেও তারা পেয়েছেন মাত্র ২১ হাজার টাকা। নলডাঙ্গা উপজেলায় পাঁচটি ইউনিয়ন ও একটি পৌর এলাকার একশ’ নয়টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অতিথি আপ্যায়নে জিআর প্রকল্পের মোট একশ’ ৬০ মেট্রিক টন চাল বিক্রির টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এই উপজেলার করের গ্রাম মাদরাসার নামে তিন মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ থাকলেও সেই প্রতিষ্ঠান নগদ মাত্র ১১ হাজার টাকা পেয়েছে।
উপজেলার আচড়াখালী উত্তরপাড়া ঈদগাহে ইসলামী জলসার অতিথি আপ্যায়নের জন্য প্রতিষ্ঠানের প্রধান আবুল হোসেনের নামে তিন মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেখানো হলেও সেখানে আদৌ কোন জলসাই হয়নি। একই উপজেলার ঠাকুর লক্ষীকোল জামে মসজিদের অতিথি আপ্যায়নের জন্য সলিমের নামে তিন মেট্রিক টন জিআর এর চাল বরাদ্দ দেখানো হলেও ওই নামে ঠাকুর লক্ষীকোলে কোন জামে মসজিদই নেই। এছাড়াও কোন কোন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে জিআর এর টাকা ২০১৭ সালের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নামে খরচ দেখানো হয়েছে কিন্তু চলতি বছরে সে সব প্রতিষ্ঠানে কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানই হয়নি বলে স্থানীয়রা জানান।
জিআর বরাদ্দের সময় চালের বাজার দর ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা মেট্রিক টন থাকলেও বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানদের চাল না দিয়ে ২৭ হাজার টাকা মেটিক টন দরে ওই চাল বিক্রি দেখানো হয়েছে। নাটোর ও নলডাঙ্গা উপজেলায বরাদ্দ করা মোট চারশ’ ৬০ মেট্রিক টন চাল এভাবে কম দামে বিক্রি দেখিয়ে মধ্যস্বত্ত ভোগীরা প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ব্যাপারে নাটোর সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার জেসমিন আখতার বানু জানান, সদরের এসিল্যান্ডকে প্রধান করে প্রকল্প বাস্তাবায়ন কর্মকর্তাকে সদস্য সচিব করে গঠিত পাঁচ সদস্যের যাচাই-বাছাই কমিটির সুপারিশেই এসব চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ওই কমিটির যাচাই-বাছাই করা দুইশ’ ২২টি প্রকল্পের একটি তালিকা তিনি নাটোরের জেলা প্রশাসক, নাটোর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং জেলা ত্রাণ ও পুনঃবার্সন কর্মকর্তার দপ্তরে জমা দিয়েছেন।
কোন প্রতিষ্ঠান বরাদ্দ করা চাল না পেয়ে নগদ টাকা কেন পেয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, খাদ্য বিভাগকে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বরাদ্দ করা ডিও লেটারের মাধ্যমে চালই সরবারাহ করতে বলা হয়েছিল কিন্তু চালের বদলে কেন টাকা দেয়া হল বা কম টাকা দেয়া হল সে ব্যাপারে কোন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অভিযোগ না আসায় তিনি সে বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান। অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান। এসব বিষয়ে জানা-জানির পর স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিরা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে শুরু করায় সংশ্লিষ্টরা নড়েচড়ে বসেছেন।
এ ব্যাপারে নাটোর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক শরিফুল ইসলাম রমজান বলেন, ভালোভাবে খোঁজ নিলে দেখা যাবে প্রায় প্রতিটি বরাদ্দেই কিছু না কিছু অনিয়ম রয়েছে, জনস্বার্থে তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
একইভাবে নলডাঙ্গা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন জানান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার রেজা হাসান যাচাই-বাছাই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী একশ’ নয়টি প্রতিষ্ঠানে নামে একশ’ ৬০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দিয়েছেন। এই উপজেলার বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে বরাদ্দকৃত চালের সবটাকা পাওয়া যায়নি। সরকারের উচিৎ মানবিক সাহায্যের এসব কর্মসুচি তদন্ত করে দেখা।