• Meni 1
  • Meni 1
  • Meni 1
  • Meni 1
  • Meni 1

রাজশাহী: শুক্রবার, ২০ জুলাই ২০১৮

এ বৈশাখ কি চেয়েছিলাম?

হুসাইন মিঠু, রাবি:বৈশাখের আয়োজন বাঙালি জাতীকে দেয় শেকড়ের সন্ধান। বৈশাখ মানেই বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির চর্চা। আচার ব্যবহার, খাবার দাবার, পোষাক পরিচ্ছেদ, খেলাধুলা, বিনোদনসহ বাঙালির জীবনের প্রতিটি কর্মকান্ডেই হাজার বছরের ঔতিহ্য ও সংস্কৃতিকে মনে করিয়ে দিতেই আসে ‘মঙ্গলময় বৈশাখ’। বৈশাখ আসে বাঙালিকে নিজস্ব সংস্কৃতির মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে পরিচয় করিয়ে দিতে। বাঙালির জীবনে কালবৈশাখী ঝড়ের উল্লাস নিয়ে আসে বৈশাখ। কিন্তু, বর্তমানে আমরা যে বৈশাখ পালন করছি, এটা বাঙালি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির রন্ধ্রে মিশে থাকা সেই বৈশাখ? এটা কি বাঙালিয়ানা ও বাঙালিপনার চর্চার বৈশাখ?
বাঙালি জাতির শত বছরের প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। আগেকার এ দিনে বৈশাখী মেলায় পাড়া মহল্লায় বসত দেশীয় বাদ্যযন্ত্র নিয়ে বাউলদের প্রাণ জুড়ানো বাংলা গানের আসর, নদীমাতৃক পূর্ব বঙ্গে ভাটিয়ালী, উত্তর বঙ্গে ভাওয়াইয়া, পশ্চিম বঙ্গে কীর্তন, বাউল, জারি সারি, পল্লীগীতি। এসব গানের মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করা যেত মা-মাটি ও মানুষের গন্ধ।
এখন সেই প্রাণে সংগীতের আবহ সৃষ্টির কারিগর অর্থাৎ ‘বাউলদের’ খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর। এই হারিয়ে যাওয়ার কারণটা হলো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। এখন আমরা বাউলদের জায়গায় স্থান করে দিয়েছি বিদেশী হেভি মেটাল গান। যে গানে না আছে শিক্ষার কিছু, না আছে নাড়ির টান।
বারবার বলে আসছি যে, বৈশাখ হলো নিজস্ব সংস্কৃতির চর্চা, নিজস্ব সত্ত¡াকে প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু আজ আধুনিকতার ছোঁয়ায় আর পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনুকরণ করতে গিয়ে দূরে ঠেলে দিচ্ছি আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি। আমরা মুখে মুখে সবাই বলি বাঙালি সংস্কৃতির চর্চার কথা। আমরা নিজেদের বাঙালি সংস্কৃতির ধ্বজাধারী বলে জাহির করি, কিন্তু আমাদের জীবনাচরণে বাঙালিপনার কোন ছিটেফোঁটাও আর অবশিষ্ট নেই।
বাঙালি একটি বিনোদন পিপাসু জাতী বলে বিশ্ব দরবারে পরিচিত। বাঙালির বিনোদনের উৎস ছিলো যাত্রা পালা, বায়োস্কোপ, পুতুল নাচ কিংবা গানের আসর। আব্বাস উদ্দিন, লালন ফকির, শাহ আব্দুল করিম, আব্দুল আলীম, রাধা রমন দত্ত, হাছন রাজার মতো জগৎবিখ্যাত গুণী শিল্পীর হৃদয় শীতল করা সুরই জোগাত বাঙালির মনের খোরাক। কিন্তু অপসংস্কৃতির আগ্রাসনে আজ আমাদের হৃদয় এই শীতল কণ্ঠে শীতল হয় না। এর জায়গায় স্থান করে দিয়েছি বিদেশীদের ভিক্ষা দেয়া রাম্প আর ডিজে নামক নোংরা সংস্কৃতি। এখন সাউন্ডবক্সে বিদেশী গানের মহড়া না থাকলে সব আয়োজন বৃথা মনে হয়।
পহেলা বৈশাখ আসলেই আমাদের মনে পড়ে যে, আমরাও বোধ হয় বাঙালি। বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি আমাদের এক প্রকার করুণা তৈরি হয় তখন। অথচ সারা বছর বিদেশি সিনেমা, সিরিয়াল আর গানে বুদ হয়ে থাকি সবাই। এমনকি কথাবার্তায়ও বিদেশি ছাপ না থাকলে বাঙালি যেন স্মার্ট হতে পারে না। ইংরেজি নিয়ে যেন গর্বিত থাকি, বাংলা-ইংরেজি মিশেল দিয়ে অদ্ভুত কায়দায় ইংরেজি বলি নিজের ব্যক্তিত্ব জাহির ও স্মার্টনেস দেখানোর জন্য। বাঙালি খাবার খই, মুড়ি, চিঁড়া, গুড়, ভাজি-ভর্তা, দেশি মাছ এসবের প্রতি এখন আমাদের অতিমাত্রায় উন্নাসিকতা, কেবল পহেলা বৈশাখ ছাড়া। আসলে আমরা নিজস্ব সত্ত¡া ও স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ফেলছি ধীরে ধীরে।
এ ধরনের স্ববিরোধী সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে কি আমরা খুব বেশি দূর এগোতে পারব? শেকড়ের সন্ধান একদিন আমাদের করতেই হবে। ফিরে যেতে হবে শেকড়ের টানে। সংস্কৃতি হচ্ছে জীবনের দর্পণ। এটা নিরন্তর চর্চার বিষয়। মুখে এক আর কাজে অন্য, এভাবে আর যাই হোক বাঙালি সংস্কৃতি চর্চাকে বেশি দূর এগিয়ে নেয়া যাবে না।
মনুষ্যত্ব তথা মানবধর্মের সাধনাই হচ্ছে সংস্কৃতি। আমরা যা ভাবী, পছন্দ করি এবং যা প্রতিদিনের জীবনাচরণে প্রতিফলিত হয় তা-ই আমাদের সংস্কৃতি। সংস্কৃতি মানে নিজস্বতা নিয়ে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা। সংস্কৃতি মানে কেবল নাচ, গান, সিনেমা-নাটক নয়। বাঙালি যদি তার নিজস্বতা হারিয়ে বিদেশি সংস্কৃতিকে বুকে ও মনে ধারণ করে সারা বছর কাটিয়ে দেয় তবে এক দিন পহেলা বৈশাখ পালন করে কী লাভ?
মানুষ জীবন সংগ্রামে ও জীবনাচরণে কল্পনাতীতভাবে অন্য প্রাণীকে যে ছাড়িয়ে গেছে, তার উজ্জ্বল প্রমাণ তার সংস্কৃতি। প্রতিদিন সচেতন সাধনার দ্বারাই সংস্কৃতিকে আয়ত্ত করতে হয়। কিন্তু আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি আজ অপসংস্কৃতির আগ্রাসনের শিকার। ফলে আমরা না পারছি বাঙালিয়ানা রক্ষা করতে, না পারছি ইতিহাস-ঐতিহ্য সচেতন হতে। সংস্কৃতির এই ভাঙ্গা সেতুর ওপর দাড়িয়ে শুধু পহেলা বৈশাখ এলেই অতিমাত্রায় বাঙালি সংস্কৃতির ধারক হয়ে ওঠা নিজের কাছে ভÐামি মনে হয়। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির এই বেমানান রুপে সাজগোজটা কেবল পহেলা বৈশাখ এলেই মনে পড়ে সবার। কিন্তু সারা বছরের জীবনাচরণ তো এক দিনে বদলানো যাবে না। এই বদলানোর ব্যবস্থাটাকে বড় হাস্যকর মনে হয় আজ।
এভাবে চলতে থাকলে আগামী প্রজন্মের কাছে আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বলতে কিছু থাকবে না। হারিয়ে যাবে আমাদের নাড়ির বাঁধন, শেকড়ের গল্প। নতুন প্রজন্মের জাহির করা কাঠগড়ায় দাড়িয়ে মাথা নিচু করে থাকা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না সেদিন। এখনই তো সময় সে দায় এড়ানোর। এই পহেলা বৈশাখ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে যেন নিজস্ব সত্ত¡ায় চলতে পারি সারাটা বছর।

AG